নারী—তিনি কেবল একটি পরিচয় নন, তিনি এক চলমান ইতিহাস। সভ্যতার সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি জাগরণ, প্রতিটি বিপ্লব, প্রতিটি অগ্রগতির অন্তরালে যে শক্তি নীরবে কাজ করেছে, তার নাম নারী। ইতিহাসের পাতায়, জ্ঞানচর্চার অঙ্গনে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, রাষ্ট্রনায়কত্বে, মহাকাশে কিংবা পর্বতচূড়ায়—নারীর পদচিহ্ন উজ্জ্বল, অনিবার্য ও অনুপ্রেরণাময়।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমরা কেবল শুভেচ্ছা জানাই না; আমরা স্মরণ করি সংগ্রাম, স্বপ্ন ও সাফল্যের সেই দীর্ঘ অভিযাত্রা।
জ্ঞান ও শিক্ষায় নারীর অগ্রদূত
Fatima al-Fihri ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর ফেজ নগরীতে University of al-Qarawiyyin প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্বের প্রাচীনতম চলমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি—যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন একজন নারী। এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি নারীর জ্ঞাননেতৃত্বের ঐতিহাসিক ঘোষণা।
অন্যদিকে Khadija bint Khuwaylid ছিলেন সফল ব্যবসায়ী ও দূরদর্শী উদ্যোক্তা। আর্থিক স্বনির্ভরতা ও প্রজ্ঞার এক অনন্য উদাহরণ তিনি। তিনি প্রমাণ করেছেন—নৈতিকতা ও নেতৃত্ব একসাথে চলতে পারে।
বিজ্ঞান, মহাকাশ ও অভিযাত্রায় নারী
Valentina Tereshkova ১৯৬৩ সালে প্রথম নারী হিসেবে মহাকাশ ভ্রমণ করেন। মহাকাশযান ভস্তক-৬–এ তাঁর সেই যাত্রা ছিল নারীর জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা।
Kalpana Chawla মহাকাশ অভিযানে অংশ নিয়ে প্রমাণ করেছেন—স্বপ্নের আকাশে নারীর ডানা সমান বিস্তৃত।
Junko Tabei ১৯৭৫ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করে দেখিয়েছেন—শিখর কোনো লিঙ্গ চেনে না।
আজ NASA-এ অসংখ্য নারী বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও মহাকাশচারী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। প্রযুক্তির অগ্রভাগে নারীর উপস্থিতি এখন বাস্তবতা।
মানবসেবায় নারী
Mother Teresa মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে বিশ্ববাসীর হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দেখিয়েছেন—সহমর্মিতা এক বিপ্লবী শক্তি। ১৯৭৯ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্যিকারের শক্তি আসে মমতা থেকে।
রাষ্ট্রনায়কত্ব ও নেতৃত্বে নারী
Queen Elizabeth II দীর্ঘকাল যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন—স্থিতিশীলতা ও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে।
Margaret Thatcher যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দৃঢ় নেতৃত্বের পরিচয় দেন।
বাংলাদেশে Khaleda Zia তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
Angela Merkel জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করে বিশ্বনেতৃত্বের অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেন।
Jacinda Ardern মানবিক ও সহানুভূতিশীল নেতৃত্বের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত।
এছাড়া Sirimavo Bandaranaike ছিলেন বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী (১৯৬০); Indira Gandhi দৃঢ় নেতৃত্বে ভারতকে পরিচালনা করেন; Ellen Johnson Sirleaf আফ্রিকার প্রথম নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপতি।
নেতৃত্ব আজ আর লিঙ্গের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়—এটি সক্ষমতার প্রশ্ন।
উচ্চশিক্ষা ও প্রশাসনে নারীর শক্ত অবস্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীরা আজ উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, ডিন ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশাসনিক দক্ষতা ও আর্থিক স্বচ্ছতায় নারীর অবদান স্পষ্ট।
Asian University of Bangladesh-এ নারী ট্রেজারার, চিফ লাইব্রেরিয়ান, ট্রাস্টি ও সিন্ডিকেট সদস্য, ডিন এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন।বাংলাদেশের প্রথম নারী ট্রেজারার শাহেদা আক্তার আর্থিক ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
নারী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
বোর্ড অব ট্রাস্টের সেক্রেটারি হিসেবে সালেহা সাদেক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করছেন। এটি প্রমাণ করে—সুযোগ পেলে নারী প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে পারেন দক্ষতার সাথে।
নারী: পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও জাতির ভিত্তি
নারী শুধু মা, বোন, কন্যা বা সহকর্মী নন—নারী একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাণশক্তি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোকবর্তিকা, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাতা।
আজকের নারী উদ্যোক্তা, প্রশাসক, শিক্ষক, গবেষক, সংসদ সদস্য, পর্বতারোহী ও মহাকাশচারীরা সম্মিলিতভাবে নতুন ইতিহাস রচনা করছেন।
অঙ্গীকার হোক সমতার
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—সমতা, সম্মান ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
জ্ঞানচর্চায় ফাতিমা আল-ফিহরি, ব্যবসায় খাদিজা (রা.), মহাকাশে তেরেশকোভা, মানবসেবায় মাদার তেরেসা, নেতৃত্বে খালেদা জিয়া—সবাই একই অগ্রযাত্রার ধারায় যুক্ত।
নারী অর্ধেক আকাশ নয়—
নারী সম্পূর্ণ মানবতার অগ্রযাত্রার শক্তি।
লেখক: চেয়ারম্যান, গ্লোবাল নলেজ ফাউন্ডেশন ও লাইব্রেরিয়ান, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
নিউজ লিংক - যুগান্তর